বই সানজাক-ই উসমান

বই রিভিউঃ সানজাক-ই উসমান
লেখকঃ প্রিন্স মুহাম্মাদ সজল
প্রকাশকঃ গার্ডিয়ান পাবলিকেশন
পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ৪৩০
মুদ্রিত মুল্যঃ ৫০০ (হার্ড কভার) ৪৫০ (পেপারব্যাক)

………………….
১.
উপন্যাস আর ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য কি?

ইতিহাস পুরোনো দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিরেট বিবরন। উপন্যাসে থাকে কিছু কেন্দ্রীয় চরিত্র, বিভিন্ন ঘটনা যাদের ঘিরে আবর্তীত হতে থাকে।

উপন্যাসে লেখকের অবাধ স্বাধীনতা থাকে। লেখক কল্পনার ঘোড়া ছুটিয়ে ভাব, আবেগ, রুপ কল্পের সাহায্যে তার চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তুলেন।

কিন্ত ঐতিহাসিকের হাত পা বাঁধা। ঘটনার বাইরে কল্পনার সুযোগ নেই। তেমন কিছুর দিকে হাত বাড়ালে ইতিহাসের মৃত্যু ঘটে, বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবে।

বিশ্বসাহিত্যে ইতিহাস নির্ভর কিংবা ঐতিহাসিক পটভুমিতে নির্মিত উপন্যাস অনেক হয়েছে। লিও তলস্তয়ের “ওয়ার এন্ড পিস”, আলেকজান্ডার দ্যুমার “থ্রি মাস্কেটিয়ার্স”, স্যার ওয়াল্টার স্কটের “তালিসম্যান”, হেনরি রাইড্যার হ্যাগার্ডের “ব্রেদেরেন”, এরিক মারিয়া রেমার্কের “অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট”, নসীম হিজাযীর “কায়সার ও কিসরা” “হিজাজের কাফেলা” তেমন কিছু উল্লেখযোগ্য নাম। বাংলা ভাষায় এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সুনীলের ত্রয়ী উপন্যাস ‘পুর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ এবং ‘সেই সময়’।

এসব উপন্যাসে কাহিনীকাকারেরা ইতিহাসের পটভুমি ঠিক রেখে চরিত্র নির্মান করেছেন। কল্পনার রঙয়ে জীবন্ত করে তুলেছেন একেকটি চরিত্র।

পড়তে পড়তে পাঠক অনায়াসে একদিকে সাহিত্যের স্বাদ পান, অন্যদিকে ইতিহাসের সে সময়ের প্রেক্ষাপট উপলব্ধি করতে পারেন। মুশকিল হল পাঠক কখনও কখনও দ্বিধায় পড়ে যান, কোনটি ঐতিহাসিক সত্য আর কোনটি লেখকের কল্পনা।
নিরেট ইতিহাস এদিক দিয়ে কিছুটা এক ঘেয়ে, ম্যাড়মেড়ে। আমজনতা তাতে রস খুজে পান না।

সানজাক-ই উসমান এই দিক দিয়ে এক অদ্ভুত সুন্দরের প্রতিচ্ছবি। উপন্যাস নয়, ইতিহাস। কিন্ত গোটা ইতিহাস এগিয়েছে উপন্যাসের গল্প বলার ঢঙয়ে।

যে বলার ভংগী এতটাই টানটান, এতটাই চমৎকার, একবার হাতে তুলে নিলে পাঠক নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন। ভুলে যাবেন নিজের আত্মসত্মা।

স্থান কাল ভুলে ডুবে যাবেন ইতিহাসের এক ঘটবাহুল অতীতে। বই শেষ করার আগে যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কোন সুযোগ নেই।
.
২.
বিশেষত্বঃ
সানজাক–ই উসমান মুলত উসামানী সম্রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে রচিত।

পশ্চিমারা আমাদের শিখায় ইতিহাস কেবল পশ্চিমাদের নিয়েই হয়। জগতের সব সজ্জন সুসভ্য মানুষেরা পশ্চিমে ছিল, আছে, থাকবে। সভ্যতার উত্থান পতন সব সেখানেই। সানজাক-ই উসমান আপনাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিবে এই তত্ব কতখানি ভুল, কতখানি ভ্রান্তিতে ভরা।

এশিয়া ও ইউরোপের বিস্তীর্ন অঞ্চলে উসমানীয়রা এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। রন কৌশল, কুটনীতি, রাষ্ট্র কাঠামো, বীরত্ব সব কিছুতে তারা ছড়িয়ে গিয়েছিল বিশের অন্য সব পরাশক্তিকে।
আরতুরুল বে, উসমানের হাত ধরে যেই সম্রাজ্যের সুচনা হয় মুরাদ, বায়েজিদ, মুহাম্মাদ আল ফাতিহের নৈপুন্যে সেই সাম্রাজ্য পায় শক্তিশালী ভীত।

বইয়ের পাতায় পাতায় মিলবে ঐতিহাসিক নানা চরিত্রের খোঁজ। মোঙ্গল হালাকু খান, চেঙ্গিস খানের নারকীয় বর্বরতা আপনার আত্মাকে কাঁপিয়ে তুলবে। তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো শাহজাদা জালাল উদ্দিনের প্রতিরোধ আপনার রক্তে নাচন ধরাবে।

আপনি মুখোমুখি হবেন ইতিহাস কুখ্যাত রক্তপিপাসু চরিত্র ‘ড্রাকুলা’র। দেখা মিলবে জালাল উদ্দিন রুমী, ইবনে বতুতা, কবি হাফিজ কিংবা প্রেমের রানী গুলবাহারের।

ক্রুসেড, স্পেনের উত্থান-পতন ইত্যাদি ইতিহাস বিখ্যাত ঘটনাগুলো আপনার চোখের সামনে ভাসবে। চেনা জানা হেরেমের বাইরে অন্য এক “হেরেমের’ সাথে পরিচয় ঘটবে আপনার।
অবাক হয়ে জানবেন, আজকের সাধারন লবঙ্গ, এলাচ, গোলমরিচ এক সময়ের বিশ্ব রাজনীতিতে কী বিস্ময়কর ভুমিকা রেখেছিল।

যুদ্ধ-সংঘাত-বিশ্বাসঘাতকতা, কুটচাল, খুন-ধর্ষন-লুট, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের নিষ্ঠুর বেঈমানী…ইতিহাসের এই পাঠ আমাদের চেনাজানা পৃথিবী থেকে একদমই আলাদা।
.
৩.
বইয়ের শক্তিশালী দিকঃ
ক. বইয়ের ভাষা আর গল্পের বুনন সত্যি অসাধারন। যে কোন টানটান ড্রামা সিরিয়ালের চাইতে কোন অংশে কম নয়।

খ. বাঁধাই, প্রচ্ছদ, কাগজের মান অত্যন্ত উন্নত।

গ. যুদ্ধের বর্ননাগুলো অনেক বেশি প্রানবন্ত। পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে হবে, তিনি নিজেই যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছেন।

ঘ. কাহিনীর ক্যানভাস অনেক বড়। তৎকালিন পৃথিবীর এক বিশাল দিক আবিষ্কার করবেন পাঠক।

ঙ. আমাদের ইতিহাসের বইগুলো হয় গুরুগম্ভীর, ভারিক্কি। একেকটা প্যারা অনেক বড়। কিন্ত এই বই লেখা হয়েছে ছোট বাক্য, ছোট ছোট প্যারায়। পড়তে গিয়ে পাঠক একটুও ক্লান্তি অনুভব করবেন না। বই ছেড়ে উঠতেও পারবেন না।

চ. গল্প বলার ঢঙয়ে ইতিহাস থাকায় খুব সহজেই কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো মাথায় গেঁথে যাবে।

বইয়ের দুর্বল দিকঃ
ক. যুদ্ধের বর্ননায় অনেক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। যেমন ‘ক্যাভলরি চার্জ’, ‘অল আউট এসল্ট’, ‘ফেইন্ড রিট্রিট’ ইত্যাদি। যুদ্ধ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ বাংলাভাষি পাঠকদের জন্য এর সঠিক অর্থ বের করা ক্ষেত্র বিশেষে দুরহ।

খ. আরো কিছু শব্দ ইংরেজিতে ব্যবহার হয়েছে, যেগুলো অনায়াসেই বাংলা করা যেত। যেমন ডিসাইসিভ (যুগান্তকারী), ডেমোগ্রাফি (জনসংখ্যা), প্রাগম্যাটিজম (বাস্তব বোধ/বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান কিংবা ধারনা।

গ. অনেক উদ্ধৃতি আছে ইংরেজিতে। সেগুলো অনুবাদ না থাকায় পাঠক কিছু ক্ষেত্রে রসবোধ থেকে বঞ্চিত হবেন। বিশেষ করে হাফিজ ও রুমির পঙতিগুলো।

ঘ. বইয়ের কলেবড় বেশ বড়। হাতে ধরে পড়াটা কিছুটা অসুবিধা জনক। পাশাপাশি কাহিনীর ব্যপ্তির বিশালতার কারনে অনেক চরিত্র মনে রাখা কঠিন।

ঙ. রাজনীতি কিংবা যুদ্ধ বিগ্রহের বর্ননার পাশাপাশি উসমানী সম্রাজ্যের আর্থ সামাজিক অবস্থা ও সংস্কারের বর্ননা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মনে হতে পারে, রাজা রাজড়ারা যুদ্ধ বিগ্রহ আর খুন খারাবী নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। সভ্যতা বিনির্মানে তাদের তেমন কোন উল্লখেযোগ্য ভুমিকা কিংবা অবদান ছিল না।

চ. গ্লোবালাইজেশন অধ্যায়ে আমেরিকা ও ইউরোপে রোগের প্রাদুর্ভাবের আলোচনায় হুট করে “রুদ্র মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহর” নাম বেমানান লেগেছে। বিশেষ করে প্রসঙ্গ বিবেচনায় তার নামটা এমন কিছু জরুরী ছিল না।
.
৪.
Spoiler
দুর্বল চিত্ত ও নরম মনের মানুষেরা বারেবারে শিউরে উঠতে পারেন।
গনহারে মানুষ হত্যা, নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, ধংসযজ্ঞ, লুটপাট, গনধর্ষনের বর্ননা আছে প্রায় প্রতি অধ্যায়ে।

একটা অংশ আমার নিজের কাছে খুব অসহনীয় মনে হয়েছে। কিন্তু পাঠক হিসেবে যেমনই লাগুক, এটাই বাস্তবতা। এটাই ইতিহাস।

সুলতান বায়েজিদ তাইমুর লংকে হুমকি দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন “তোমাকে যদি যুদ্ধে হারাই, তাহলে তোমার স্ত্রীদের নগ্ন করে আমি নাচের আসর বসাব। তাদের হাতে আমি শরাব পান করব”

যুদ্ধে বায়েজিদ পরাজিত হন। তাইমুর বায়েজীদের সাথে নিষ্ঠুর রসিকতা করেন। তাইমুর এক ভোজ সভার আয়োজন করেন।
সেখানে বন্দী বায়েজীদকে ফিরিয়ে দেয়া হয় তার রাজকীয় পাগড়ি, পোশাক ও সিংহাসন। বায়েজিদ দারুন অবাক হন।

শুরু হয় নাচ গান। এক সময় বায়েজিদ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন, তার প্রিয় তিন স্ত্রীকে এনে হাজির করা হয়েছে ভোজ সভায়। তিনজনই নগ্ন। এ অবস্থাতেই তারা তাইমুরকে খাবার পরিবেশন করছিলেন।

বায়েজিদ আর এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলেন না।

তারপর কি হল? জানতে হলে চোখ রাখুন বইয়ের পাতায়।
.

৫.
সানজাক-ই উসমান বাংলা সাহিত্যে এক কালজয়ী সৃষ্টি হিসেবে স্থান করে নিবে বলেই আমার বিশ্বাস। উপন্যাসের ঢঙয়ে এমন স্বার্থক ইতিহাস রচনা আর কেউ করেছেন কিনা জানা নেই। সে হিসেবে প্রিন্স সজল এক নতুন ধারার সুচনা করলেন।

আমি অবাক হয়েছি শুনে, গোটা বইটা তিনি মোবাইলে লিখেছেন। বই পড়ে বুঝতে পারলাম, কী পরিমান পড়াশুনা ও অধ্যবস্যা তাকে করতে এই হয়েছে এই একটি বই লিখতে গিয়ে। দোয়া করি, তার এই সাধনা যেন চলমান থাকে। আমরা যেন ইতিহাস নির্ভর আরো এমন লেখার স্বাদ পাই।

বইটি পড়তে গিয়ে আমার একটি গান বারবার মনে পড়ছিল “পৃথিবীতে কেউ স্থায়ী হয়না/হোক না সে ফেরাউন কিবা নমরুদ/কেউ ভবে চিরদিন রয় না”

ইতিহাসের সে সব রথী মহারথীরা আজ আর নেই। এভাবেই একদিন সবাই চলে যাবে। কিন্ত ক্ষমতার মদমত্ততায় সবাই এ কথা ভুলে যায়। ধরাকে সরা জ্ঞান করে। ক্ষমতার লোভে মানবতার চরম অপমান করতে এতটুকু দ্বিধা করে না।

ভুলে যায়, মৃত্যুর পরের জগতে তাদের সব অপকর্মের হিসাব দিতে হবে। লক্ষ মানুষের আর্তনাদ, চোখের পানি একদিন অভিশাপ হয়ে তাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিবে মহামহিম প্রভুর আদালতে।

এ যুগের রাষ্ট্রনায়কেরাও তার ব্যতিক্রম নয়।

Comments

Popular posts from this blog

TruConnect APN Settings

T Mobile LTE APN Settings 2019

Straight Talk APN Settings

MetroPCS APN Settings

AT&T APN Settings

LycaMobile APN Settings US

Cricket APN Settings For Android

TracFone APN Settings

NTA apn settings Marshall islands for BlackBerry

TPG APN Settings: Step by Step Guide

You Can See APN Settings by Country